নিউজ ডেস্ক, স্টার বাংলা টুডে:গত তিন দশক ধরে বৈশ্বিক পোশাক ক্রেতাদের প্রধান প্রশ্ন ছিল—কোন দেশে সবচেয়ে কম খরচে, ঠিক সময়ে ও ভালো মানের পণ্য তৈরি করা যায়। এই প্রশ্ন এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তবে আগামী পাঁচ বছরে শুধু কম দাম দিয়ে ক্রয়াদেশ ধরে রাখা সম্ভব হবে না। এখন ক্রেতারা শুধু উৎপাদন খরচ দেখছেন না; তাঁরা দেখছেন শুল্ক, পণ্যের উৎসবিধি, কাঁচামালের অনুসরণযোগ্যতা, শ্রম অধিকার, পরিবেশগত তথ্য, রাজনৈতিক ঝুঁকি, জ্বালানি ব্যয় এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র সংরক্ষণ ও সরবরাহ করার সক্ষমতা।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য এটি একই সঙ্গে বড় ঝুঁকি ও বড় সুযোগ। কারণ, বিশ্ববাজার এখন আর শুধু সস্তা উৎপাদন খুঁজছে না; তারা খুঁজছে এমন সরবরাহকারী, যারা পণ্য তৈরি করতে পারে, পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলের তথ্য দিতে পারে, শ্রম ও পরিবেশগত ঝুঁকি ব্যাখ্যা করতে পারে এবং সময়মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণপত্র জমা দিতে পারে।
ক্রেতারা যা বিবেচনায় নেবেন
আগে অনেক ক্রেতা শুধু কারখানার দেওয়া দাম দেখে ক্রয়াদেশ দিতেন। এখন তাঁরা দেখতে চাইবেন মোট প্রকৃত খরচ—অর্থাৎ পণ্যের দাম, শুল্ক, পরিবহন, বিলম্বের ঝুঁকি, কাগজপত্রের ঘাটতি, কাস্টমসে আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা, অনুসরণযোগ্যতার খরচ এবং মাননিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার খরচ মিলিয়ে আসল ব্যয় কত দাঁড়ায়।
কোনো কারখানা যদি কম দামে পণ্য তৈরি করতে পারে, কিন্তু কাঁচামালের উৎস, তুলার উৎস, সুতার উৎস, কাপড়ের মিল, রাসায়নিক ব্যবহারের তথ্য, শ্রমিকের অধিকারসংক্রান্ত তথ্য বা পণ্যের গঠন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দিতে না পারে, তাহলে সেই সরবরাহকারী ভবিষ্যতে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হবে। তাই আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু কম দামে নয়, বরং কম ঝুঁকির নির্ভরযোগ্য সরবরাহে।
পণ্যের উৎস এখন বড় বাস্তবতা
পণ্যের উৎস এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আগে অনেক ক্ষেত্রে কোন দেশে কাটিং ও সেলাই হয়েছে, সেটিই পণ্যের উৎস হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু এখন সুতা, কাপড়, বোতাম, জিপার ও অন্যান্য উপকরণ কোথা থেকে এসেছে, সেটিও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে চীনা উপকরণ, তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠানো এবং জবরদস্তিমূলক শ্রমের ঝুঁকি নিয়ে নজরদারি বাড়ছে।
এই জায়গায় বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, বাংলাদেশের নিজস্ব স্পিনিং, নিটিং, ডাইং, ফিনিশিং ও তৈরি পোশাক উৎপাদনের একটি শক্তিশালী ভিত্তি আছে। যদি স্থানীয় মূল্য সংযোজন আরও বাড়ানো যায় এবং কাঁচামাল থেকে তৈরি পোশাক পর্যন্ত তথ্য প্রমাণসহ দেখানো যায়, তাহলে অনেক প্রতিযোগী দেশের তুলনায় বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে যেতে পারে।
ইইউর বাজারে তথ্য ও প্রমাণ হবে নতুন শর্ত
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে ভবিষ্যতে পণ্যের ডিজিটাল পাসপোর্ট, পরিবেশবান্ধব পণ্য নকশা, মানবাধিকারভিত্তিক যথাযথ যাচাই এবং জবরদস্তিমূলক শ্রম প্রতিরোধ আইন বড় ভূমিকা রাখবে। এর অর্থ হলো, পোশাক তৈরি করলেই হবে না; পণ্যের পেছনের তথ্যও দিতে হবে।
কোন ফাইবার ব্যবহৃত হয়েছে, কত শতাংশ পুনর্ব্যবহৃত উপাদান আছে, কোন রাসায়নিক ব্যবহৃত হয়েছে, কোন কারখানায় কোন ধাপ সম্পন্ন হয়েছে, শ্রমিকের অধিকার কীভাবে রক্ষা করা হয়েছে এবং পণ্যের পরিবেশগত প্রভাব কত—এসব তথ্য ক্রেতারা চাইবেন।
যেসব কারখানা এই তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও সরবরাহ করতে পারবে, তারা ভবিষ্যতে ক্রেতাদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হবে।
বাংলাদেশের করণীয়
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে কম দামের প্রতিযোগিতা থেকে বের হয়ে নির্ভরযোগ্য, তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল সরবরাহব্যবস্থার দিকে যাওয়া।
কারখানাগুলোকে এখন থেকেই কাঁচামালের উৎস অনুসরণ, রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি দক্ষতা, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার, শ্রমিক কল্যাণের প্রমাণ, অভিযোগ নিষ্পত্তিব্যবস্থা, উৎপাদন তথ্য সংরক্ষণ ও পরিবেশগত তথ্য ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করতে হবে।
একই সঙ্গে শিল্প সংগঠনগুলোর উচিত পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসনভিত্তিক তথ্যভান্ডার, মানবাধিকারভিত্তিক যথাযথ যাচাই সহায়তা, পণ্যের ডিজিটাল পাসপোর্ট প্রস্তুতি, সবুজ অর্থায়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ আরও জোরদার করা।
ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা
আগামী পাঁচ বছর তৈরি পোশাক খাতের জন্য সহজ হবে না। তবে বাংলাদেশ সঠিক প্রস্তুতি নিতে পারলে এটি বড় সুযোগের সময়ও হতে পারে।
যাঁরা শুধু কম দামের ক্রয়াদেশ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকবেন, তাঁরা চাপের মুখে পড়বেন। আর যাঁরা তথ্য, প্রমাণ, অনুসরণযোগ্যতা, জ্বালানি দক্ষতা, স্থানীয় মূল্য সংযোজন, দ্রুত যোগাযোগ ও দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি করবেন, তাঁরা ভবিষ্যতের বৈশ্বিক পোশাকবাজারে শক্ত অবস্থান নিতে পারবেন।
সুতরাং আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু কত কম দামে পণ্য তৈরি করা যায়—এর ওপর হবে না। প্রতিযোগিতা হবে কতটা নির্ভরযোগ্য, প্রমাণযোগ্য, টেকসই এবং ঝুঁকিমুক্ত সরবরাহ দেওয়া যায়—তার ওপর।






















