০৭:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬

ভোটে হারলেন মমতা, রাজনীতিতে হার মানবেন কি

  • আপডেট: ১০:৪৪:৪০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬
  • ১৫

ওয়েব ডেস্ক, স্টার বাংলা টুডেঃ দুই দিনের ভ্রমণের ধকল নিয়েও নিজের গ্রামে ছুটিতে গিয়েছিলেন সীমা দাস, উদ্দেশ্য ভোট দেওয়া। ভোটের আগে যেন পৌঁছাতে পারেন, সে জন্য মাঝে ট্রেনও বদল করেন তিনি। গৃহকর্মী সীমা দাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী, তবে থাকেন রাজধানী নয়াদিল্লিতে। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য তাঁর বাড়ি ছুটে যাওয়া।

সীমা দাস আগে সব সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিতেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১ সাল থেকে রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা একটি মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তবে এবার শাশুড়ির কথায় মত পাল্টান সীমা দাস। শাশুড়ি তাঁকে বলেছেন, ‘দিদি’ (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) নাকি মুসলিমদের বেশি সুবিধা দেন।

এটি এমন এক অভিযোগ, যা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে করে আসছে। কারণ, তৃণমূল কংগ্রেস ধর্মীয় সহনশীলতা ও সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষার ওপর জোর দেয়।

গত ১৫ বছর ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দল ৯ কোটির বেশি মানুষের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছে। একই সময়ে বিজেপি ধীরে ধীরে সেখানে শক্তি বাড়িয়েছে।

একসময় পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি খুবই দুর্বল অবস্থানে ছিল। তবে গত সোমবার সেই পরিস্থিতি বদলে যায়। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে মোদির দলের জয় ঘোষিত হয়।

গত সোমবার ভারতের মোট পাঁচটি রাজ্যের নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয়। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে অভিনেতা থালাপতি বিজয় চমক দেখান। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত নতুন দল তামিলাগা ভেত্তরি কাজাগাম রাজ্যের শক্তিশালী দলগুলোকে হারিয়ে দিয়েছে। পাশের রাজ্য কেরালায় কেন্দ্রীয় বিরোধী দল কংগ্রেস বামপন্থী জোটকে হারিয়ে জয় পেয়েছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস দল থেকে বের হয়ে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) গঠন করেন। কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭৭ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা বামপন্থী জোটকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে অনীহা দেখানোয় হতাশ হয়ে তিনি এমন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

একসময়ের ফরাসি উপনিবেশ পুদুচেরিতে ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এসেছে। উত্তর-পূর্বের রাজ্য আসামেও বিজেপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় টিকে গেছে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে এই পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি এবং ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে জন–অসন্তোষ কাজে লাগিয়ে বিজেপি এই রাজ্যে বড় জয় পেয়েছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে বের হয়ে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন। সাধারণ এক পরিবার থেকে উঠে আসা মমতা ছাত্র আন্দোলন থেকে রাজনীতিতে এসে ২০১১ সালে বামপন্থীদের পরাজিত করে ক্ষমতায় আসেন। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি বিজেপির অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন।

মুসলমানদের সুরক্ষা দেওয়া ছাড়াও মমতা নারীদের জন্য বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করেন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিতর্কিত জমি অধিগ্রহণের বিরোধিতা করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দৈনন্দিন জীবনে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে এই ক্ষোভ বেড়েছে।

ভোটের আগে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় ৯০ লাখের বেশি মানুষ বাদ পড়ে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এতে বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং বিরোধীরা অভিযোগ করে যে এতে পক্ষপাত ছিল।

এই নির্বাচনে প্রায় ৬ কোটি ৮২ লাখ মানুষ ভোট দেন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৯২.৯৩ শতাংশ—রাজ্যের ইতিহাসে রেকর্ড।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেস নতুন কিছু উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং সরকারবিরোধী ক্ষোভ সামাল দিতে পারেনি। এর ফলে বিজেপির জয় সহজ হয়েছে।

এছাড়া ধর্মীয় বিভাজনও বড় ভূমিকা রেখেছে। শহর ও গ্রামের ভোটারদের মধ্যে পছন্দের পার্থক্য স্পষ্ট ছিল। বিজেপির প্রচারণা ছিল সুসংগঠিত, যা ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।

ভোটার তালিকা সংশোধন, আধা সামরিক বাহিনীর বিপুল মোতায়েন এবং নির্বাচনী পরিবেশ নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিরোধীরা অভিযোগ করে, এসবের মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করা হয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু এসব কারণেই ফলাফল নির্ধারিত হয়নি; বরং জনঅসন্তোষ ও রাজনৈতিক মেরুকরণ বড় ভূমিকা রেখেছে।

সবশেষে, বিশ্লেষকেরা মনে করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহজে হার মানবেন না। তিনি দলীয় কর্মীদের শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে আরও রাজনৈতিক নাটকীয়তা দেখা যেতে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

যশোরের আ,লীগের কার্যলয়সহ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

ভোটে হারলেন মমতা, রাজনীতিতে হার মানবেন কি

আপডেট: ১০:৪৪:৪০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬

ওয়েব ডেস্ক, স্টার বাংলা টুডেঃ দুই দিনের ভ্রমণের ধকল নিয়েও নিজের গ্রামে ছুটিতে গিয়েছিলেন সীমা দাস, উদ্দেশ্য ভোট দেওয়া। ভোটের আগে যেন পৌঁছাতে পারেন, সে জন্য মাঝে ট্রেনও বদল করেন তিনি। গৃহকর্মী সীমা দাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী, তবে থাকেন রাজধানী নয়াদিল্লিতে। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য তাঁর বাড়ি ছুটে যাওয়া।

সীমা দাস আগে সব সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিতেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১ সাল থেকে রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা একটি মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তবে এবার শাশুড়ির কথায় মত পাল্টান সীমা দাস। শাশুড়ি তাঁকে বলেছেন, ‘দিদি’ (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) নাকি মুসলিমদের বেশি সুবিধা দেন।

এটি এমন এক অভিযোগ, যা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে করে আসছে। কারণ, তৃণমূল কংগ্রেস ধর্মীয় সহনশীলতা ও সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষার ওপর জোর দেয়।

গত ১৫ বছর ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দল ৯ কোটির বেশি মানুষের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছে। একই সময়ে বিজেপি ধীরে ধীরে সেখানে শক্তি বাড়িয়েছে।

একসময় পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি খুবই দুর্বল অবস্থানে ছিল। তবে গত সোমবার সেই পরিস্থিতি বদলে যায়। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে মোদির দলের জয় ঘোষিত হয়।

গত সোমবার ভারতের মোট পাঁচটি রাজ্যের নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয়। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে অভিনেতা থালাপতি বিজয় চমক দেখান। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত নতুন দল তামিলাগা ভেত্তরি কাজাগাম রাজ্যের শক্তিশালী দলগুলোকে হারিয়ে দিয়েছে। পাশের রাজ্য কেরালায় কেন্দ্রীয় বিরোধী দল কংগ্রেস বামপন্থী জোটকে হারিয়ে জয় পেয়েছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস দল থেকে বের হয়ে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) গঠন করেন। কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭৭ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা বামপন্থী জোটকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে অনীহা দেখানোয় হতাশ হয়ে তিনি এমন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

একসময়ের ফরাসি উপনিবেশ পুদুচেরিতে ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এসেছে। উত্তর-পূর্বের রাজ্য আসামেও বিজেপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় টিকে গেছে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে এই পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি এবং ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে জন–অসন্তোষ কাজে লাগিয়ে বিজেপি এই রাজ্যে বড় জয় পেয়েছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে বের হয়ে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন। সাধারণ এক পরিবার থেকে উঠে আসা মমতা ছাত্র আন্দোলন থেকে রাজনীতিতে এসে ২০১১ সালে বামপন্থীদের পরাজিত করে ক্ষমতায় আসেন। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি বিজেপির অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন।

মুসলমানদের সুরক্ষা দেওয়া ছাড়াও মমতা নারীদের জন্য বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করেন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিতর্কিত জমি অধিগ্রহণের বিরোধিতা করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দৈনন্দিন জীবনে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের কারণে এই ক্ষোভ বেড়েছে।

ভোটের আগে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় ৯০ লাখের বেশি মানুষ বাদ পড়ে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এতে বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং বিরোধীরা অভিযোগ করে যে এতে পক্ষপাত ছিল।

এই নির্বাচনে প্রায় ৬ কোটি ৮২ লাখ মানুষ ভোট দেন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৯২.৯৩ শতাংশ—রাজ্যের ইতিহাসে রেকর্ড।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেস নতুন কিছু উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং সরকারবিরোধী ক্ষোভ সামাল দিতে পারেনি। এর ফলে বিজেপির জয় সহজ হয়েছে।

এছাড়া ধর্মীয় বিভাজনও বড় ভূমিকা রেখেছে। শহর ও গ্রামের ভোটারদের মধ্যে পছন্দের পার্থক্য স্পষ্ট ছিল। বিজেপির প্রচারণা ছিল সুসংগঠিত, যা ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।

ভোটার তালিকা সংশোধন, আধা সামরিক বাহিনীর বিপুল মোতায়েন এবং নির্বাচনী পরিবেশ নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিরোধীরা অভিযোগ করে, এসবের মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করা হয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু এসব কারণেই ফলাফল নির্ধারিত হয়নি; বরং জনঅসন্তোষ ও রাজনৈতিক মেরুকরণ বড় ভূমিকা রেখেছে।

সবশেষে, বিশ্লেষকেরা মনে করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহজে হার মানবেন না। তিনি দলীয় কর্মীদের শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে আরও রাজনৈতিক নাটকীয়তা দেখা যেতে পারে।