১১:৫৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে আসার পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে আক্রমণাত্মক

  • আপডেট: ১১:১৫:২৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
  • ৪১

নিউজ,ডেস্ক, স্টার বাংলা টুডেঃ কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছেন। শুল্কনীতি থেকে শুরু করে সামরিক সংঘাত—বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই কৌশল তাঁকে কিছু সাফল্য এনে দিলেও ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্য হুমকি, অপমানসূচক মন্তব্য ও চাপ প্রয়োগনির্ভর কৌশল তেহরানের সঙ্গে সমঝোতার পথ আরও কঠিন করে তুলছে।

১১ সপ্তাহ ধরে চলা এই সংকট ইতিমধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। দুই পক্ষের অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহেও নতুন সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যদি সত্যিই শান্তিপূর্ণ সমাধান চান, তাহলে তাঁকে প্রকাশ্য বক্তব্যে তীব্র ভাষা ব্যবহার কমাতে হবে। কারণ, ইরানের শাসকদের জন্য নিজেদের জনগণের কাছে মর্যাদা রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের বহু নেতা নিহত এবং সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইরান এখনো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাব বজায় রেখেছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প এখনো সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ, অনিশ্চয়তা ও কড়া ভাষানির্ভর কৌশল অব্যাহত রেখেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি এই সংঘাত থেকে এমনভাবে বের হতে চাইছেন, যাতে এটি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ বিজয় হিসেবে তুলে ধরা যায়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি পুরোপুরি সেই দাবি সমর্থন করে না। একইভাবে ইরানও প্রকাশ্যে পরাজয় মেনে নিতে রাজি নয়।

ইরান বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক আলোচক রব ম্যালি বলেন, কোনো সরকারই আত্মসমর্পণের ভাবমূর্তি বহন করতে পারে না। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি একটি যৌক্তিক সমঝোতায় পৌঁছানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রব ম্যালি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্য, যুদ্ধ নিয়ে জনঅসন্তোষ এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের চাপ ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। রিপাবলিকান পার্টিও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস অবশ্য ট্রাম্পের কৌশলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর দাবি, ট্রাম্পের কূটনৈতিক পদ্ধতি অতীতে সফল হয়েছে এবং ইরানও এখন সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী হয়ে উঠছে।

ধ্বংসাত্মক হুমকি ও উত্তেজনা

গত মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, কোনো চুক্তি না হলে ইরানের সভ্যতাই ধ্বংস করে দেওয়া হবে। পরে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ওই বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া হয়েছিল এবং এটি জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে অনুমোদিত ছিল না।

পরে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও আবারও ইরানের অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দেন। এমনকি তিনি ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় এমন মন্তব্যও করেন, যা অনেকে পারমাণবিক হামলার ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যদিও ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি কখনো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা ভাবেননি।

একদিকে ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরান পুরোপুরি বিধ্বস্ত এবং সমঝোতার জন্য মরিয়া। অন্যদিকে তেহরান তা অস্বীকার করে নিজেদের টিকে থাকাকেই সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। ইরানের দাবি, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মধ্যরাতের পোস্ট

সংকটপূর্ণ মুহূর্তগুলোয় ট্রাম্প প্রায়ই নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মধ্যরাতের পর কঠোর বার্তা দিয়েছেন। গত মাসে তিনি হঠাৎ করে ইরানের বন্দর অবরোধের ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।

গত সোমবার ট্রাম্প ইরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবকে ‘আবর্জনা’ বলে মন্তব্য করেন। এতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন উপদেষ্টা ডেনিস রস বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্যের অসংগতি ও কৌশলগত ধৈর্যের অভাব তাঁর নিজের বার্তাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।

কেন ইরানের ক্ষেত্রে কৌশল কাজ করছে না

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের হুমকিনির্ভর কৌশল অন্য কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও ইরানের ক্ষেত্রে তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের গভীর প্রভাব এবং নিজেদের দীর্ঘ ইতিহাস নিয়ে জাতীয় গর্ব দেশটিকে চাপের মুখেও আপস না করার মানসিকতা দিয়েছে।

সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা নেট সোয়ানসন বলেন, অনেকের ভুল ধারণা যে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করলে ইরান আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু বাস্তবে ইরানের ক্ষেত্রে বিষয়টি এভাবে কাজ করে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের কঠোর হুমকি বরং ইরানের নতুন নেতৃত্বকে আরও কট্টর অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। ফলে সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে আসার পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে আক্রমণাত্মক

আপডেট: ১১:১৫:২৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

নিউজ,ডেস্ক, স্টার বাংলা টুডেঃ কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছেন। শুল্কনীতি থেকে শুরু করে সামরিক সংঘাত—বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই কৌশল তাঁকে কিছু সাফল্য এনে দিলেও ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্য হুমকি, অপমানসূচক মন্তব্য ও চাপ প্রয়োগনির্ভর কৌশল তেহরানের সঙ্গে সমঝোতার পথ আরও কঠিন করে তুলছে।

১১ সপ্তাহ ধরে চলা এই সংকট ইতিমধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। দুই পক্ষের অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহেও নতুন সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যদি সত্যিই শান্তিপূর্ণ সমাধান চান, তাহলে তাঁকে প্রকাশ্য বক্তব্যে তীব্র ভাষা ব্যবহার কমাতে হবে। কারণ, ইরানের শাসকদের জন্য নিজেদের জনগণের কাছে মর্যাদা রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের বহু নেতা নিহত এবং সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইরান এখনো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাব বজায় রেখেছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প এখনো সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ, অনিশ্চয়তা ও কড়া ভাষানির্ভর কৌশল অব্যাহত রেখেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি এই সংঘাত থেকে এমনভাবে বের হতে চাইছেন, যাতে এটি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ বিজয় হিসেবে তুলে ধরা যায়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি পুরোপুরি সেই দাবি সমর্থন করে না। একইভাবে ইরানও প্রকাশ্যে পরাজয় মেনে নিতে রাজি নয়।

ইরান বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক আলোচক রব ম্যালি বলেন, কোনো সরকারই আত্মসমর্পণের ভাবমূর্তি বহন করতে পারে না। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি একটি যৌক্তিক সমঝোতায় পৌঁছানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রব ম্যালি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্য, যুদ্ধ নিয়ে জনঅসন্তোষ এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের চাপ ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। রিপাবলিকান পার্টিও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস অবশ্য ট্রাম্পের কৌশলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর দাবি, ট্রাম্পের কূটনৈতিক পদ্ধতি অতীতে সফল হয়েছে এবং ইরানও এখন সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী হয়ে উঠছে।

ধ্বংসাত্মক হুমকি ও উত্তেজনা

গত মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, কোনো চুক্তি না হলে ইরানের সভ্যতাই ধ্বংস করে দেওয়া হবে। পরে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ওই বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া হয়েছিল এবং এটি জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে অনুমোদিত ছিল না।

পরে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও আবারও ইরানের অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দেন। এমনকি তিনি ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় এমন মন্তব্যও করেন, যা অনেকে পারমাণবিক হামলার ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যদিও ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি কখনো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা ভাবেননি।

একদিকে ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরান পুরোপুরি বিধ্বস্ত এবং সমঝোতার জন্য মরিয়া। অন্যদিকে তেহরান তা অস্বীকার করে নিজেদের টিকে থাকাকেই সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। ইরানের দাবি, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মধ্যরাতের পোস্ট

সংকটপূর্ণ মুহূর্তগুলোয় ট্রাম্প প্রায়ই নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মধ্যরাতের পর কঠোর বার্তা দিয়েছেন। গত মাসে তিনি হঠাৎ করে ইরানের বন্দর অবরোধের ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।

গত সোমবার ট্রাম্প ইরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবকে ‘আবর্জনা’ বলে মন্তব্য করেন। এতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন উপদেষ্টা ডেনিস রস বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্যের অসংগতি ও কৌশলগত ধৈর্যের অভাব তাঁর নিজের বার্তাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।

কেন ইরানের ক্ষেত্রে কৌশল কাজ করছে না

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের হুমকিনির্ভর কৌশল অন্য কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও ইরানের ক্ষেত্রে তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের গভীর প্রভাব এবং নিজেদের দীর্ঘ ইতিহাস নিয়ে জাতীয় গর্ব দেশটিকে চাপের মুখেও আপস না করার মানসিকতা দিয়েছে।

সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা নেট সোয়ানসন বলেন, অনেকের ভুল ধারণা যে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করলে ইরান আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু বাস্তবে ইরানের ক্ষেত্রে বিষয়টি এভাবে কাজ করে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের কঠোর হুমকি বরং ইরানের নতুন নেতৃত্বকে আরও কট্টর অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। ফলে সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে