০২:৩৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬

আর্জেন্টিনা কি বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিচ্ছে, না ‘পিকনিক’ করছে

  • আপডেট: ১২:৪৫:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬
  • ১১

ম্যাচ শেষে লিওনেল স্কালোনি যখন সংবাদ সম্মেলনে বসলেন, তখন তাঁর শরীরী ভাষায় এক অদ্ভুত প্রশান্তি। দিন তিনেক আগে মৌরিতানিয়াকে ২-১ গোলে হারানোর পর জাম্বিয়াকেও ৫-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। জয়ের আনন্দ থাকারই কথা। কিন্তু সেই নিস্তরঙ্গ প্রশান্তিতে হুট করেই যেন একপশলা অস্বস্তির বৃষ্টি নামালেন এক আগন্তুক।

সবাই যখন প্রশ্ন করার সুযোগ খুঁজছেন, তখন পেছন থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন এক ব্যক্তি। গায়ে ১৯৮৬ সালের সেই বিখ্যাত অ্যাওয়ে জার্সি, যেটির পেছনে নামের জায়গায় লেখা ‘মানো দে দিওস’—ঈশ্বরের হাত। হাতে মাইক্রোফোন নেই, কিন্তু গলায় অদ্ভুত এক আর্তি। স্কালোনিকে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘মৌরিতানিয়া কিংবা জাম্বিয়া কি আর্জেন্টিনার জন্য সঠিক মানের প্রতিপক্ষ? ওদিকে ফ্রান্সের ‘সি’ দলও কিন্তু কলম্বিয়াকে হারিয়ে দিচ্ছে!’

আর্জেন্টিনার প্রেস অফিসার তাঁকে থামানোর চেষ্টা করলেন। নিরাপত্তাকর্মীরা সরিয়ে দিতে চাইলেন। এতে ওই লোক যেন আরও মরিয়া হয়ে উঠলেন। প্রায় আর্তনাদের সুরে বললেন, ‘আমি তো সাহায্য করতে চাই। মানুষ তো এসব জানতেই চায়!’ স্কালোনি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হাসলেন। ওই আগন্তুককে সরিয়ে দেওয়া হলো শেষ পর্যন্ত। তবে লোকটা যে প্রশ্নটা বাতাসে ভাসিয়ে দিয়ে গেলেন, সেটা আসলে উঠেছে আরও অনেকের মনেই। বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা কি তবে স্রেফ আত্মতুষ্টির সাগরে ভাসছে? মৌরিতানিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে গোল করেন এনজো ফার্নান্দেজএএফপি

সামনেই বিশ্বকাপ। শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নামবে আলবিসেলেস্তেরা। অথচ তাদের প্রস্তুতি সার্কাসের চেয়ে কম কিছু নয়। ইরানের যুদ্ধের কারণে স্পেনের বিপক্ষে কাতারে অনুষ্ঠিতব্য ‘ফিনালিসিমা’ বাতিল হয়ে গেল। এরপর তড়িঘড়ি করে আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন (এএফএ) প্রতিপক্ষ খুঁজে আনল মৌরিতানিয়া আর জাম্বিয়াকে!

এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সেই একটাই নাম—লিওনেল মেসি। ৩৮ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলার অপেক্ষায় তিনি। অথচ এখন পর্যন্ত স্কালোনি বা মেসি—কেউই নিশ্চিত করেননি মেসি খেলবেন কি না।

 

স্কালোনিকে যখনই মেসির অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তিনি সাবলীলভাবে তা এড়িয়ে যান। টানা দুবার কোপা আমেরিকা আর কাতার বিশ্বকাপ জেতানো কোচের গায়ে সমালোচনার আঁচ লাগে না ঠিকই, কিন্তু মেসি-মহিমার কাছে তিনিও যেন অসহায়। স্কালোনি বলছেন, ‘সবই নির্ভর করছে ওর মনের ওপর, ওর ফিটনেসের ওপর। ও নিজেই নিজের ভাগ্য ঠিক করার অধিকার অর্জন করেছে।’

কিন্তু মেসি কিসের অপেক্ষা করছেন? বাছাইপর্বে ১২ ম্যাচে ৮ গোল করে তিনিই সর্বোচ্চ গোলদাতা। ইন্টার মায়ামির হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লিগ মাতাচ্ছেন। তাহলে কি বড় কোনো দলের বিপক্ষে নিজের কার্যকারিতা নিয়ে খোদ ‘এলএমটেন’ নিজেই সন্দিহান!

আসলে  প্রত্যাশার চাপ কতটা অসহ্য হতে পারে, মেসির চেয়ে ভালো কেউ জানে না। ২০২১-এর আগে এই নিজ দেশের মানুষই তাঁকে ট্রফি না জেতার দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল। দোহার লুসাইলে সেই ঐতিহাসিক ফাইনালের পর অমরত্ব পেয়ে গেছেন। চাইলে তখনই বিদায় নিতে পারতেন। কিন্তু এখন তিনি দোদুল্যমান। পেশির চোট বারবার হানা দিচ্ছে, হারিয়ে গেছে সেই অতিমানবীয় গতি। বিশ্বকাপের মতো ক্ষিপ্রতার মঞ্চে যদি মেসি তাঁর সেরাটা দিতে না পারেন, তবে সেই স্মৃতি হবে বড় বেদনার।
তাঁর এবং আর্জেন্টিনার!

আর্জেন্টিনা এখন সেই বাঘের মতো, যে শিকার ভুলে বনভোজনে মেতেছে। বনের অন্য শিকারিরা কিন্তু ঠিকই দাঁত শাণাচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

সর্বাধিক পঠিত

যশোরের আ,লীগের কার্যলয়সহ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

আর্জেন্টিনা কি বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিচ্ছে, না ‘পিকনিক’ করছে

আপডেট: ১২:৪৫:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

ম্যাচ শেষে লিওনেল স্কালোনি যখন সংবাদ সম্মেলনে বসলেন, তখন তাঁর শরীরী ভাষায় এক অদ্ভুত প্রশান্তি। দিন তিনেক আগে মৌরিতানিয়াকে ২-১ গোলে হারানোর পর জাম্বিয়াকেও ৫-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। জয়ের আনন্দ থাকারই কথা। কিন্তু সেই নিস্তরঙ্গ প্রশান্তিতে হুট করেই যেন একপশলা অস্বস্তির বৃষ্টি নামালেন এক আগন্তুক।

সবাই যখন প্রশ্ন করার সুযোগ খুঁজছেন, তখন পেছন থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন এক ব্যক্তি। গায়ে ১৯৮৬ সালের সেই বিখ্যাত অ্যাওয়ে জার্সি, যেটির পেছনে নামের জায়গায় লেখা ‘মানো দে দিওস’—ঈশ্বরের হাত। হাতে মাইক্রোফোন নেই, কিন্তু গলায় অদ্ভুত এক আর্তি। স্কালোনিকে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘মৌরিতানিয়া কিংবা জাম্বিয়া কি আর্জেন্টিনার জন্য সঠিক মানের প্রতিপক্ষ? ওদিকে ফ্রান্সের ‘সি’ দলও কিন্তু কলম্বিয়াকে হারিয়ে দিচ্ছে!’

আর্জেন্টিনার প্রেস অফিসার তাঁকে থামানোর চেষ্টা করলেন। নিরাপত্তাকর্মীরা সরিয়ে দিতে চাইলেন। এতে ওই লোক যেন আরও মরিয়া হয়ে উঠলেন। প্রায় আর্তনাদের সুরে বললেন, ‘আমি তো সাহায্য করতে চাই। মানুষ তো এসব জানতেই চায়!’ স্কালোনি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হাসলেন। ওই আগন্তুককে সরিয়ে দেওয়া হলো শেষ পর্যন্ত। তবে লোকটা যে প্রশ্নটা বাতাসে ভাসিয়ে দিয়ে গেলেন, সেটা আসলে উঠেছে আরও অনেকের মনেই। বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা কি তবে স্রেফ আত্মতুষ্টির সাগরে ভাসছে? মৌরিতানিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে গোল করেন এনজো ফার্নান্দেজএএফপি

সামনেই বিশ্বকাপ। শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নামবে আলবিসেলেস্তেরা। অথচ তাদের প্রস্তুতি সার্কাসের চেয়ে কম কিছু নয়। ইরানের যুদ্ধের কারণে স্পেনের বিপক্ষে কাতারে অনুষ্ঠিতব্য ‘ফিনালিসিমা’ বাতিল হয়ে গেল। এরপর তড়িঘড়ি করে আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন (এএফএ) প্রতিপক্ষ খুঁজে আনল মৌরিতানিয়া আর জাম্বিয়াকে!

এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সেই একটাই নাম—লিওনেল মেসি। ৩৮ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলার অপেক্ষায় তিনি। অথচ এখন পর্যন্ত স্কালোনি বা মেসি—কেউই নিশ্চিত করেননি মেসি খেলবেন কি না।

 

স্কালোনিকে যখনই মেসির অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তিনি সাবলীলভাবে তা এড়িয়ে যান। টানা দুবার কোপা আমেরিকা আর কাতার বিশ্বকাপ জেতানো কোচের গায়ে সমালোচনার আঁচ লাগে না ঠিকই, কিন্তু মেসি-মহিমার কাছে তিনিও যেন অসহায়। স্কালোনি বলছেন, ‘সবই নির্ভর করছে ওর মনের ওপর, ওর ফিটনেসের ওপর। ও নিজেই নিজের ভাগ্য ঠিক করার অধিকার অর্জন করেছে।’

কিন্তু মেসি কিসের অপেক্ষা করছেন? বাছাইপর্বে ১২ ম্যাচে ৮ গোল করে তিনিই সর্বোচ্চ গোলদাতা। ইন্টার মায়ামির হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লিগ মাতাচ্ছেন। তাহলে কি বড় কোনো দলের বিপক্ষে নিজের কার্যকারিতা নিয়ে খোদ ‘এলএমটেন’ নিজেই সন্দিহান!

আসলে  প্রত্যাশার চাপ কতটা অসহ্য হতে পারে, মেসির চেয়ে ভালো কেউ জানে না। ২০২১-এর আগে এই নিজ দেশের মানুষই তাঁকে ট্রফি না জেতার দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল। দোহার লুসাইলে সেই ঐতিহাসিক ফাইনালের পর অমরত্ব পেয়ে গেছেন। চাইলে তখনই বিদায় নিতে পারতেন। কিন্তু এখন তিনি দোদুল্যমান। পেশির চোট বারবার হানা দিচ্ছে, হারিয়ে গেছে সেই অতিমানবীয় গতি। বিশ্বকাপের মতো ক্ষিপ্রতার মঞ্চে যদি মেসি তাঁর সেরাটা দিতে না পারেন, তবে সেই স্মৃতি হবে বড় বেদনার।
তাঁর এবং আর্জেন্টিনার!

আর্জেন্টিনা এখন সেই বাঘের মতো, যে শিকার ভুলে বনভোজনে মেতেছে। বনের অন্য শিকারিরা কিন্তু ঠিকই দাঁত শাণাচ্ছে।