নিউজ ডেস্ক স্টার বাংলা টুডে: ভারতের তামিলনাড়ু অঙ্গরাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রায় ৪৯ বছর পর অভিনেতা থেকে মুখ্যমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন জোসেফ বিজয় চন্দ্র শেখর (থালাপতি বিজয়)। এর আগে সর্বশেষ ১৯৭৭ সালে এম.জি. রামাচন্দ্রন (এমজিআর)-এর হাত ধরে অভিনয় থেকে ক্ষমতায় যাওয়ার ঘটনা ঘটে রাজ্যটিতে।
তামিল নাড়ুর রাজনীতির ইতিহাসে অভিনয় থেকে সরাসরি ক্ষমতায় যাওয়ার শেষ উদাহরণ ছিলেন এমজিআর। ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জয় পান এবং ১৯৮৭ সাল (মৃত্যুর পূর্ব) পর্যন্ত এক দশক তামিলনাড়ু শাসন করেন।
এরপর বহু অভিনেতা রাজনীতিতে এলেও কেউই সরাসরি সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করতে পারেননি। অভিনেত্রী থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া জে. জয়ললিতা অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী হন, তবে তিনি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে নয়, বরং এমজিআরের প্রতিষ্ঠিত এআইএডিএমকে-র নেতৃত্ব গ্রহণ করার মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন।
তবে এবারের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে থালাপতি বিজয়ের মাত্র দুই বছর আগে গড়া দল তামিলাগা ভেট্টরি কাজাগম (টিভিকে) প্রায় ১০০ থেকে ১১৮ আসনের মধ্যে অবস্থান করছে। ২৩৪ আসনের বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১১৮ আসন। ফলে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও তিনি রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে থাকছেন।
তিনি প্রথমে ২০০৯ সাল থেকেই তার বিশাল ফ্যান ক্লাবকে সংগঠিত করতে শুরু করেন, যা পরে ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’ নামে পরিচিত হয়। শুরুতে এটি ছিল সামাজিক সহায়তা ও জনকল্যাণমূলক সংগঠন, যা ধীরে ধীরে বুথ পর্যায়ের রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করে। শিক্ষা সহায়তা, দুর্যোগ সহায়তা এবং স্থানীয় পর্যায়ের কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা জনসংযোগ বাড়ায়।
২০১১ সালে এই সংগঠন প্রকাশ্যে এআইএডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থন দেয়, যা ছিল তার প্রথম নির্বাচনী রাজনৈতিক অবস্থান।
২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনার মাধ্যমে বিজয় স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক অবস্থান নিতে শুরু করেন। এরপর তার সিনেমা-ঘনিষ্ঠ অনুষ্ঠানগুলোতে বেকারত্ব, দুর্নীতি, শিক্ষা ও তরুণদের সমস্যা নিয়ে বক্তব্য বাড়তে থাকে।
২০২১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কামের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের বড় অংশে জয় পায়, যা প্রমাণ করে যে তার জনপ্রিয়তা ভোটে রূপান্তরিত হতে পারে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তামিলাগা ভেট্টরি কাজাগম (টিভিকে) গঠন করেন। পরবর্তীতে তাদের দল ঘোষণা করে যে, তারা ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এবং কোনো পূর্ব-নির্বাচনী জোটে যাবে না। একই সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছরের ক্যারিয়ার শেষ করে তিনি চলচ্চিত্র থেকে অবসরের ঘোষণাও দেন।
পরবর্তী দুই বছরে টিভিকে তাদের সংগঠনকে জেলা, কেন্দ্র ও বুথ পর্যায়ে শক্তিশালী কাঠামোয় রূপান্তর করে। দলের রাজনৈতিক বার্তায় মূলত শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং স্বচ্ছ প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি গুরুত্ব পায়।
তবে এই যাত্রা সহজ ছিল না। ২০২৫ সালে করুরে টিভিকে সংশ্লিষ্ট এক কর্মসূচিতে পদদলিত হয়ে প্রাণহানির ঘটনায় দলটি বড় সংকটে পড়ে, যা সংগঠনগত দুর্বলতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
বর্তমানে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, যদি টিভিকে অন্তত ১১০ আসনের মতো অবস্থান ধরে রাখতে পারে, তবে সরকার গঠনে বিজয়ই হতে পারেন কেন্দ্রীয় মুখ। এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও তিনি সরকার গঠনের ‘কিংমেকার’ ভূমিকায় থাকবেন।
এই পরিস্থিতিতে তামিলনাড়ু আবারও ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে যাচ্ছে। ডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোট, এআইএডিএমকে এবং নতুন শক্তি টিভিকে- এই তিনটি দল প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিজয়ের উত্থান এমজিআরের সময়ের রাজনৈতিক ঢেউয়ের মতো হলেও এর ভিত্তি ভিন্ন। এটি বেশি প্রজন্মভিত্তিক হতাশা, শাসনব্যবস্থার প্রতি আস্থা সংকট এবং ‘পরিচ্ছন্ন রাজনীতি’র প্রতিশ্রুতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
২০২৬ সালের নির্বাচন তাই শুধু একজন অভিনেতার রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং তামিলনাড়ুর রাজনীতির পুরো কাঠামোকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।





















