ডেস্ক নিউজ, স্টার বাংলা টুডে:২০১৮ সালের নভেম্বর মাসের কথা। মুক্তি পেয়েছিল থালাপতি বিজয়ের সিনেমা ‘সরকার’। সেই সিনেমাতে বিজয়কে রাজনৈতিক চরিত্রে দেখা যায়। তিনি তামিলনাড়ুর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়ে জিতে যান। সিনেমাটিতে তিনি ‘সুন্দর রামাস্বামী’ চরিত্রে অভিনয় করেন। চরিত্রে তাকে একজন সফল প্রবাসী ব্যবসায়ী হিসেবে দেখা যায়। পর্দায় বিজয় কেবল তার ভোট দিতেই ভারতে ফিরেছিলেন। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে গিয়ে জানতে পারেন, তার ভোট আরেকজন দিয়ে দিয়েছে। এরপর শুরু হয় প্রায় দুই ঘণ্টার গল্প। যেখানে নির্বাচনী জালিয়াতি, রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করেন। তিনি ভোটারদের কেবল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ব্যবস্থা ভেঙে দেন।
সিনেমার শেষ দিকে দেখা যায়, থালাপতির দল নির্বাচনে জয়ী হলেও তিনি নিজে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেননি। এর বদলে তিনি একজন সৎ ও যোগ্য সরকারি কর্মকর্তাকে (কালেক্টর) মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেন। থালাপতির চরিত্র ‘সুন্দর’ মূলত একজন কিঙমেকার হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছিলেন, যিনি সিস্টেম বদলানোর পর ক্ষমতার লোভ ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের পাশে থাকাই বেছে নেন।
এখন চলছে ২০২৬ সাল। আট বছরের ব্যবধানে সিনেমার সেই ঘটনাই চিত্রনাট্য ছাড়া বাস্তব হয়ে ফিরে এলো! ভারতের তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে বড় জয়ে পেয়েছে দক্ষিণী সুপারস্টার বিজয় থালাপতির দল তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম (টিভিকে)। প্রথমবারের নির্বাচনে অংশ নিয়েই তার এই সাফল্য রাজনৈতিক মহলে বড় চমক তৈরি করেছে।
২৩৪টি আসনের মধ্যে ১০৭টিতে জয়লাভ করে থালাপতি প্রমাণ করেছেন, পর্দার জনপ্রিয়তা শুধু বিনোদনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং জনমানুষের আস্থাতেও তার অবস্থান অনেক ওপরে। অভিনেতা থেকে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী বনে যাওয়ার এই যাত্রাকে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার রথী-মহারথীরা একটি নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন।
বিজয়ের এই ঐতিহাসিক জয়ে শুভেচ্ছায় ভাসাচ্ছে পুরো ইন্ডাস্ট্রি। কিংবদন্তি অভিনেতা রজনীকান্ত থেকে শুরু করে অভিনেতা ধানুশ, অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানা এবং সুরকার এ আর রহমানও তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। দক্ষিণী সিনেমার এই শীর্ষ নায়ককে এখন রাজনীতির মাঠের আসল ‘হিরো’ হিসেবেই মেনে নিচ্ছেন প্রায় সকলেই।
এবার বলতে হয়, ব্যক্তি থালাপতি বিজয়ের কথা। তিনি আর দশজন তারকার মতো নন। ছবির প্রচারে খুব কমই দেখা যায়, সাক্ষাৎকারও দেন না বললেই চলে। পর্দার বাইরের জীবনটাও রেখেছেন বেশ আড়ালে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগ দিয়েছেন মাত্র কয়েক বছর আগে, সেখানেও তেমন সক্রিয় নন। এমনকি সিনেমার স্টিল ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত ছবিও খুব একটা সামনে আসে না।
এমন একজন সংরক্ষিত স্বভাবের মানুষ যখন রাজনীতিতে যোগ দেন, স্বাভাবিকভাবেই অনেকেই বিস্মিত হন। কারণ রাজনীতি মানেই তো মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, জনসভা, বক্তৃতা—নিজেকে উন্মুক্ত করে দেওয়া। প্রশ্ন উঠেছিল, খোলসের ভেতরে থাকা এই মানুষটি কি পারবেন সেই চ্যালেঞ্জ নিতে?
সময়ই তার উত্তর দিয়েছে। বিজয় প্রমাণ করেছেন, তিনি পারেন। তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দল জয়ের পথে—এমন আলোচনা এখন তুঙ্গে। সব কিছু ঠিক থাকলে, তিনিই হতে পারেন রাজ্যটির পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী।
২০০০-এর দশক: ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’, ২০১২-এর পর থেকে পর্দায় তাঁকে দেখা গেছে সমাজ বদলের নায়ক হিসেবেই। এই সময়ে ‘কাথি’-তে কৃষকের দুর্দশা, ‘মারসেল’-এ স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি, ‘বিগিল’-এ খেলাধুলায় নারীদের অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি। এসব বিষয় তুলে ধরে তিনি ধীরে ধীরে সামাজিক বার্তার নায়ক হয়ে ওঠেন।
তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়ে দেওয়া হলফনামায় উঠে এসেছে তাঁর আর্থিক অবস্থার বিস্তারিত চিত্র। হলফনামা অনুযায়ী, বিজয়ের মোট সম্পদের পরিমাণ ৬০৩ কোটি রুপি। বিজয়ের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মধ্যে বড় অংশই অস্থাবর—প্রায় ৪০৪ দশমিক ৫৮ কোটি রুপি। বাকি ১৯৮ দশমিক ৬২ কোটি রুপি স্থাবর সম্পদ। তাঁর সম্পদের তালিকায় রয়েছে কোদাইকানালে কৃষিজমি আর চেন্নাইসহ বিভিন্ন জায়গায় বাণিজ্যিক ও আবাসিক সম্পত্তি। নগদ অর্থ হিসেবে হাতে রয়েছে প্রায় দুই লাখ রুপি। পাশাপাশি ব্যাংকের বিভিন্ন হিসাবে জমা রয়েছে ২১৩ কোটির বেশি। সোনা-রুপার অলংকারও আছে—মোট ৮৮৩ গ্রাম, যার মূল্য প্রায় ১৫ লাখ রুপি। বিলাসবহুল গাড়ির তালিকাও কম দীর্ঘ নয়। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে বিএমডব্লিউ, টয়োটার কয়েকটি বিলাসবহুল গাড়ি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিজয়ের মোট আয় ছিল ১৮৪ দশমিক ৫৩ কোটি রুপি। তাঁর আয়ের উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে স্বনিযুক্ত কাজ, সুদের আয় এবং সম্পত্তি থেকে ভাড়া। হলফনামায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে—বিজয় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের ব্যক্তিগত ঋণ দিয়েছেন। এর মধ্যে স্ত্রী সংগীতাকে দিয়েছেন ১২ দশমিক ৬ কোটি রুপি। এ ছাড়া তাঁর বাবা এস এ চন্দ্রশেখর, মা শোভা শেখর, ছেলে জেসন সঞ্জয় এবং মেয়ে দিব্যা সাশাকেও ঋণ দিয়েছেন তিনি। শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রসঙ্গে বিজয় উল্লেখ করেছেন, ১৯৮৯ ও ১৯৯১ সালে যথাক্রমে দশম ও দ্বাদশ শ্রেণি পাস করেন। পরে বিএসসি পড়তে ভর্তি হলেও সেই পড়াশোনা শেষ করেননি।
বিজয় রাজনীতিতে নামার অনেক আগেই তাঁর সিনেমা সেই প্রস্তুতি তৈরি করে দিয়েছে। তাঁর ছবির অডিও প্রকাশের অনুষ্ঠান হয়ে উঠত ‘সফট রাজনৈতিক ভাষণ’। ভক্তকুল—যাঁরা আগে শুধু সিনেমা উদ্যাপন করত, ধীরে ধীরে সংগঠিত হয়ে ওঠে রাজনৈতিক নেটওয়ার্কে। ২০১০-এর দশকের শেষ এবং ২০২০-এর দশকের শুরুর দিকে সিনেমার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিজয়ের উপস্থিতি ও কথাবার্তায় রাজনৈতিক বার্তা থাকতে শুরু করে। ২০১৯ সালে ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন’ (সিএএ) নিয়ে তাঁর সমালোচনা এমনটাই ইঙ্গিত দিয়েছিল যে তিনি চলচ্চিত্রের গণ্ডির বাইরে নিজের অবস্থান তৈরি করতে চান।
ভক্তদের সঙ্গে সভা এবং নানা সমাজসেবামূলক অনুষ্ঠানে পরীক্ষার চাপ, তরুণদের বেকারত্ব, দুর্নীতি ও সুশাসনের মতো বিষয়গুলো বেশি বেশি করে আলোচনা হতে থাকে। এ কথাগুলো নতুন ভোটার ও শহরের স্বপ্নবান তরুণদের গভীরভাবে নাড়া দেয়।
বিজয়ের যুক্তি স্পষ্ট—রাজনীতি আংশিকভাবে করা যায় না। জনগণ পূর্ণ সময়ের নেতা চায়। তামিল রাজনীতির ইতিহাসও সেটাই বলে। এমজিআর ও জয়ললিতা ক্ষমতায় যাওয়ার আগে অভিনয় ছেড়েছিলেন। বিপরীতে কমল হাসানের মতো যাঁরা একসঙ্গে সিনেমা ও রাজনীতি করেছেন, তাঁদের সাফল্য সীমিত। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই বিজয়ের সিদ্ধান্ত—পুরোদমে রাজনীতি। মালয়েশিয়ায় এইচ বিনোথের ‘জানা নায়গান’ ছবির গানমুক্তির অনুষ্ঠানে এই অবসরের ঘোষণা করেন বিজয়। তাই ‘জানা নায়গান’ অভিনেতার শেষ ছবি হতে চলেছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মঞ্চে গানের তালে কোমরও দোলান তিনি। সেদিন নীরবতা ভেঙে অনেক কথাই বলেন তিনি।
অভিনয়জীবন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বিজয় জানান, ৩৩ বছর ধরে তিনি সমালোচনার শিকার। নানা সমালোচকদের আক্রমণ সামলেছেন। ‘নেতিবাচক-ইতিবাচক—সব ধরনের সমালোচনার তীর বিঁধেছে আমাকে। পাশাপাশি, ভক্তদের অকুণ্ঠ ভালোবাসা পেয়েছি। তাঁদের মুখ চেয়েই আমি এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলাম।’ অভিনেতা-রাজনীতিবিদের কথায়, ‘অনুরাগীরা ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ। তাই আগামী ৩৩ বছর তাঁদের জন্য কাজ করতে চাই। আমি রাজনীতিবিদ হিসেবে বাকি জীবন কাটাতে চাইছি। আমাকে ভক্তদের ঋণ শোধ করতে হবে।’
উল্লেখ্য, আগামী ৮ মে প্রায় ৫ হাজার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতে যাওয়া ‘জানা নায়াগান’ বা ‘জনগণের নায়ক’ শুধু একটি সিনেমা নয়—এটি যেন রাজনৈতিক ঘোষণা। ছবিতে আছে জাঁকজমকপূর্ণ অ্যাকশন, ভিএফএক্স, আর সংলাপ—‘রাজনীতিতে এসেছি লুটপাট করতে নয়, সেবা করতে।’ এই সংলাপ যেন সরাসরি বিজয়ের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন। মুক্তির আগে অবশ্য সিনেমাটি বারবার পিছিয়েছে। ভারতের সার্টিফিকেশন বোর্ড আপত্তি জানিয়েছে, নির্মাতারা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। এমনকি মুক্তির আগে সিনেমাটির এইচডি প্রিন্টও ফাঁস হয়েছে অনলাইনে। তবু ভক্তের উৎসাহে কমতি নেই। বিজয়ের দল যদি সত্যই জিতে যায়, সিনেমাটি দেখতে নিশ্চিতভাবে ভিড় করবেন ভক্তরা। ‘জন নায়গান’–এ জনগণের নায়ককে দেখতে।





















